ঢাকা, বুধবার ২৬, আগস্ট ২০২৬ ১২:৩৯:৫৯ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
পাকিস্তানের হাসপাতালে এসি বিস্ফোরণ, ১৫ নবজাতকের মৃত্যু রংপুরে চার খুন, মা-মেয়ের মরদেহে ধর্ষণের আলামত নেই ডলি পার্টন আর নেই, থামল ‘কান্ট্রি কুইনের’ গান ভুটানের রাজার সঙ্গে রাষ্ট্রপতির সৌজন্য সাক্ষাৎ মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নতুন সচিব রওশন আরা ডিমের বাজারে ফের অস্বস্তি, এক ডজন ১৫০–১৫৫ টাকা পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) আজ

পাকড়া মাছরাঙা: জলের ওপর শূন্যে ভেসে শিকার ধরা পাখি

আইরীন নিয়াজী মান্না | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৫:০৫ পিএম, ২৫ আগস্ট ২০২৬ মঙ্গলবার

ছবি: সংগ্রহিত।

ছবি: সংগ্রহিত।

নদীর ধারে কিংবা কোনো শান্ত জলাশয়ের পাশে দাঁড়িয়ে হঠাৎ চোখে পড়তে পারে সাদা-কালো রঙের ছোট্ট একটি পাখি। কখনো বাঁশের খুঁটিতে, কখনো গাছের ডালে, আবার কখনো তার বা বেড়ার ওপর বসে আছে। কিছুক্ষণ পরই সে ডানা মেলে জলের ওপর স্থির হয়ে দাঁড়ানোর মতো শূন্যে ভেসে থাকে। তারপর বিদ্যুতের মতো সোজা নিচে নেমে পানিতে ঝাঁপ—মুহূর্তের মধ্যেই ঠোঁটে শিকার নিয়ে ফিরে আসে। এই অসাধারণ শিকারি পাখিটিই পাকড়া মাছরাঙা।

পাকড়া মাছরাঙার ইংরেজি নাম পাইড কিংফিশার এবং বৈজ্ঞানিক নাম Ceryle rudis। বাংলাদেশে এটি একটি পরিচিত আবাসিক পাখি। নদী, খাল, বিল, হাওর, পুকুর, হ্রদ ও অন্যান্য জলাভূমির আশপাশে এদের দেখা যায়। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এর বিস্তৃতি রয়েছে।

সাদা-কালোর চমৎকার সাজ

পাকড়া মাছরাঙাকে প্রথম দেখাতেই চেনা যায় তার কালো-সাদা পালকের জন্য। মাথার ওপর রয়েছে ছোট ঝুঁটি বা ঝুঁটির মতো পালক। মাথা, চোখের চারপাশ ও বুকের ওপর কালো দাগের নকশা, আর শরীরের নিচের অংশ প্রধানত সাদা। ডানা ও লেজেও রয়েছে কালো-সাদার সুন্দর বিন্যাস।

পুরুষ ও স্ত্রী পাকড়া মাছরাঙার মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। পুরুষের বুকে সাধারণত দুটি কালো দাগের বন্ধনী দেখা যায়, আর স্ত্রীর ক্ষেত্রে বুকের কালো বন্ধনীটি একটিমাত্র এবং মাঝখানে কিছুটা ভাঙা থাকে। এর ঠোঁট কালচে এবং বেশ শক্ত ও তীক্ষ্ণ।

প্রায় ৩০ সেন্টিমিটার লম্বা এই পাখিটির সৌন্দর্য তার রঙের বাহারে নয়, বরং তার আচরণে। জলের ওপর শিকার করার সময় তার অসাধারণ কৌশলই তাকে অন্য অনেক মাছরাঙা থেকে আলাদা করে।

শূন্যে ভেসে থাকা তার বিশেষ কৌশল

পাকড়া মাছরাঙার সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো এক জায়গায় ডানা ঝাপটে শূন্যে ভেসে থেকে পানির নিচে শিকার খুঁজে বের করা। পাখিবিশারদদের ভাষায় এই আচরণকে ‘হোভারিং’ বলা হয়।

জলের ওপর কয়েক সেকেন্ড স্থির থাকার পর হঠাৎ সে শরীরকে তীরের মতো সোজা করে পানিতে ঝাঁপ দেয়। ছোট মাছ তার প্রধান খাদ্য। পাশাপাশি ব্যাঙাচি ও জলজ পোকামাকড়ও খায়। বাংলাদেশের একটি তথ্যসূত্রে পাকড়া মাছরাঙার খাদ্যতালিকায় মাছের আধিক্যের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, পাকড়া মাছরাঙা বিভিন্ন জলাভূমি ব্যবহার করলেও স্রোতধারা বা ছোট নদীর মতো জলাশয়ে সবচেয়ে বেশি সময় কাটিয়েছে। গবেষণাটিতে দেখা যায়, সেখানে মোট পর্যবেক্ষণ সময়ের ৪০ দশমিক ৬৬ শতাংশ তারা স্রোতধারায় কাটিয়েছে। শিকারের জন্য তারা বেড়া, বাঁশ, গাছ ও তারকেও বসার জায়গা হিসেবে ব্যবহার করেছে।

নদীর পাড়ে মাটির ভেতর সংসার

পাকড়া মাছরাঙা গাছে বাসা বানায় না। নদী, খাল কিংবা জলাশয়ের খাড়া মাটির পাড়ে সুড়ঙ্গ তৈরি করে বাসা বানানোই তাদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য।

মাটির পাড়ে গর্ত করে তারা বেশ গভীর সুড়ঙ্গ তৈরি করে। সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে থাকে ডিম ও ছানার জন্য আলাদা কক্ষ। সাধারণত স্ত্রী পাখি কয়েকটি সাদা ডিম পাড়ে। বাংলাদেশে প্রকাশিত একটি তথ্যসূত্রে ৫–৬টি ডিম পাড়ার কথা উল্লেখ রয়েছে।

তাদের বাসা তৈরির কৌশলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও একটি অদ্ভুত আচরণ। বাসার প্রবেশমুখের কাছে কখনো কখনো সাপের খোলসের অংশ দেখা যায়। এটি শত্রুকে ভয় দেখানোর একটি প্রতিরক্ষামূলক কৌশল হতে পারে বলে পাখিবিষয়ক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

জলাভূমির স্বাস্থ্যেরও এক নীরব বার্তাবাহক

পাকড়া মাছরাঙার জীবন পুরোপুরি জলজ পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত। মাছ ধরতে হলে প্রয়োজন স্বচ্ছ ও জীবন্ত জলাশয়; বসার জন্য প্রয়োজন নদীর পাড়, গাছ, বাঁশ, বেড়া কিংবা অন্য কোনো উঁচু জায়গা; আর বংশবিস্তারের জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত মাটির পাড়।

তাই কোনো এলাকায় নিয়মিত পাকড়া মাছরাঙার উপস্থিতি সেই এলাকার জলাভূমির জীববৈচিত্র্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা যেতে পারে। জলাশয় ভরাট হয়ে গেলে, নদীর পাড় নষ্ট হলে কিংবা পানিতে দূষণ বাড়লে তাদের খাদ্য ও বাসস্থান—দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

বাংলাদেশের চেনা অথচ বিস্ময়কর পাখি

পাকড়া মাছরাঙা বাংলাদেশে বিরল কোনো পাখি নয়; বরং নদী-জলাশয়কেন্দ্রিক অঞ্চলে এটি বেশ পরিচিত। তবে পরিচিত বলেই তার গুরুত্ব কম নয়। আমাদের চারপাশের জলাভূমি, নদী ও বিলের সঙ্গে যে অসংখ্য প্রাণীর জীবন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে, পাকড়া মাছরাঙা তাদেরই একজন প্রতিনিধি।

একটি নদীর পাড়ে বসে থাকা পাকড়া মাছরাঙাকে তাই শুধু সুন্দর একটি পাখি হিসেবে দেখলে তার পুরো গল্পটি জানা হয় না। তার সাদা-কালো শরীরের আড়ালে রয়েছে এক দুর্দান্ত শিকারির কৌশল, নদীর পাড়ের মাটিতে লুকিয়ে থাকা একটি সংসার এবং বাংলাদেশের জলাভূমির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক।

জলের ওপর শূন্যে ভেসে থাকা সেই ছোট্ট পাখিটি যখন হঠাৎ পানিতে ঝাঁপ দিয়ে আবার উঠে আসে, তখন মনে হয়—প্রকৃতি আসলে কত নিখুঁতভাবে প্রতিটি প্রাণীকে তার নিজের জীবনের জন্য তৈরি করে দিয়েছে। পাকড়া মাছরাঙা সেই বিস্ময়েরই এক জীবন্ত উদাহরণ।

লেখক: আহবায়ক, বাংলাদেশ বার্ড ওয়াচার সোসাইটি।